বাংলাদেশের এক প্রবাসীর সংগ্রাম ও প্রতিষ্ঠা
শাবুল আহমেদ: ১৯৯৭ সাল। কুমিল্লার এক শান্ত গ্রাম থেকে মাত্র ৯ বছরের কিশোর খলিল জামান পা রাখেন স্বপ্নের শহর প্যারিসে। মাটির সোঁদা গন্ধ আর কাঁচা রাস্তার স্মৃতি পিছে ফেলে ইউরোপের আধুনিক নগরসভ্যতায় এসে থমকে গিয়েছিল তার সেই শৈশব। ভাষা অজানা, অচেনা সমাজ আর ভিন্ন শিক্ষাব্যবস্থা—সব মিলিয়ে শুরু হয়েছিল এক দীর্ঘ কঠিন লড়াইয়ের গল্প। আজ প্রায় তিন দশক পর, সেই কিশোর এখন প্যারিসের বুকে এক প্রতিষ্ঠিত প্রবাসী। সম্প্রতি ফরাসি পত্রিকা Le monde তাকে নিয়ে একটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
শেকড় ও প্রবাসের সন্ধিক্ষণ
তার এই যাত্রার ভিত গড়ে দিয়েছিলেন বাবা। পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে ১৯৮৫ সালেই ফ্রান্সে পাড়ি জমিয়েছিলেন তিনি। দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর ১৯৯৭ সালে যখন পরিবারের অন্য সদস্যদের প্যারিসে নিয়ে আসেন, তখন বাবার চেহারাও প্রায় ভুলে গিয়েছিল সেই কিশোর। ছোটবেলায় বাবাকে কাছে না পাওয়ায় তিনি নিজের চাচাকেই ‘বাবা’ বলে ডাকতেন। দীর্ঘ প্রবাস জীবনের এই বিচ্ছেদই ছিল তাদের ত্যাগের প্রথম অধ্যায়।
ভিনদেশে জীবনসংগ্রামের শুরু
প্যারিসে এসেই সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় ভাষা। ৯ বছর বয়সে ফরাসি ভাষার একটি শব্দও যার জানা ছিল না, তার জন্য স্কুলে মানিয়ে নেওয়া ছিল রীতিমতো যুদ্ধ। সহপাঠীদের উপহাস আর বৈষম্যের শিকার হতে হয়েছে বারবার। তবুও দমে যাননি। কিছু সহমর্মী বন্ধুর সহযোগিতায় ধীরে ধীরে নিজেকে মানিয়ে নেন ফরাসি পরিবেশের সঙ্গে। পড়াশোনায় মেধাবী ছিলেন, বিশেষ করে গণিতে ছিল বিশেষ দখল। কিন্তু ভাষাগত জটিলতা আর জীবনবাস্তবতার চাপে পড়াশোনা বেশিদূর এগোয়নি। কারিগরি শিক্ষায় ভর্তি হলেও একসময় কলম ছেড়ে জীবন যুদ্ধে নামতে হয় তাকে।
শ্রম থেকে স্বাবলম্বী হওয়ার পথ
কর্মজীবনের শুরুটা ছিল কঠোর পরিশ্রমের। প্রথমে একটি বিলাসবহুল হোটেলের রান্নাঘরে কাজ শুরু করেন। পরবর্তীতে প্যারিসের একটি পাঁচ তারকা হোটেলে ‘ভ্যালেট পার্কিং’ (গাড়ি পার্কিং) এর কাজ নেন। কঠোর পরিশ্রমে সেখানে বকশিশসহ মাসে প্রায় ৪ হাজার ইউরো (বাংলাদেশি মুদ্রায় ৫ লাখ টাকার বেশি) আয় করতেন। কিন্তু রাতের ডিউটি আর অনিয়মিত জীবন তার ব্যক্তিগত স্বপ্নে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছিল। পেশা পরিবর্তনের সিদ্ধান্তে তিনি বেছে নেন।
উদ্যোক্তা হিসেবে আত্মপ্রকাশ
পরবর্তীতে তিনি প্যারিসে মোবাইল ফোনের ব্যবসায় বিনিয়োগ করেন। বর্তমানে এই খাতে তিনি একজন সফল ব্যবসায়ী। তার মতে, কঠোর পরিশ্রম আর সততা থাকলে ইউরোপের মাটিতে বাংলাদেশিদের জন্য সাফল্যের অনেক সুযোগ রয়েছে। কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তিনি বলেন, "ফ্রান্স আমাকে অনেক কিছু দিয়েছে। সমাজকে আন্তরিকভাবে কিছু দিলে সমাজও তার প্রতিদান দেয়।"
আগামীর স্বপ্ন
তার বাবা জীবনের বেশিরভাগ সময় ফ্রান্সে কাটিয়ে দিলেও নিজ জন্মভূমিতে আর ফেরা হয়নি। বাবার সেই আত্মত্যাগ আজ তাকে প্রতিনিয়ত তাড়িত করে। বর্তমানে এক সন্তানের জনক এই প্রবাসী নিজের সন্তানদের সুশিক্ষিত করে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখছেন। তিনি চান, তার সন্তানরা যেন সেই সব সুযোগ পায় যা তাদের পূর্ববর্তী প্রজন্মের কাছে ছিল অসাধ্য। কুমিল্লার সেই ছোট্ট কিশোর আজ প্যারিসের ব্যস্ত নাগরিক, যার সাফল্যের পেছনে লুকিয়ে আছে কয়েক দশকের দীর্ঘ নিঃশ্বাস আর অদম্য ইচ্ছাশক্তি। এটি কেবল একজন খলিল জামানের গল্প নয়, বরং হাজারো প্রবাসী বাংলাদেশির নিঃশব্দ সংগ্রামে এক সার্থক প্রতিচ্ছবি।
Parisreports / Parisreports
বাংলাদেশের এক প্রবাসীর সংগ্রাম ও প্রতিষ্ঠা
জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় প্যারিসে 'চেঞ্জ নাউ' সম্মেলন
ফ্রান্সে পালিত হলো বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা দিবস
পর্তুগালে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রবাসী যুবকের মৃত্যু
কুয়েতের বাইরে থাকা প্রবাসীদের ভিসার মেয়াদ বাড়ল ৩ মাস
বাহরাইনে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় বাংলাদেশি নিহত
ড্রোন হামলায় আহত ৪ বাংলাদেশিকে দেখতে যান -কুয়েতের রাষ্ট্রদূত
অসহায় পরিবারকে বসতঘর দিলো সাফ
এইচআরসি এ্যাওয়ার্ড পদকের জন্য মনোনীত সাংবাদিক এনায়েত সোহেল
সামাজিক এসোসিয়েশন সাফ’র কমিটি পুনর্গঠন
ওমানে সড়ক দুর্ঘটনায় চট্টগ্রামের একই পরিবারের তিনজনের মৃত্যু
ফ্রান্স যুবদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হলেন সাইফুল ইসলাম রনি